December 6, 2022, 1:29 am

করোনাকালেও দুর্নীতি, মিনিষ্ট্রি অডিট চলছে রাজধানীর ১২ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, মার্চ ৭, ২০২১
  • 140 Time View

শিক্ষাজব ডেস্ক:

বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে রাজধানী ঢাকার অন্তত ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তদন্ত চলছে। দুর্নীতির অভিযোগগুলো হচ্ছে- ছুটির মধ্যে বিভিন্ন পদে নিয়োগে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া, নিয়োগ পরীক্ষার খাতায় টেম্পারিং বা ঘষামাজা, আর্থিক অনিয়ম, জমি কেনায় অপচয় বা আত্মসাৎ, নিয়ম ভেঙে শিক্ষার্থী ভর্তি, প্রতিষ্ঠানের দোকান বরাদ্দে স্বার্থসিদ্ধি প্রভৃতি। তদন্তে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত মূল ব্যক্তি অধ্যক্ষ অথবা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি। তবে, মূল অভিযোগ এড়িয়ে আবেদনের ভিত্তিতে খণ্ডিত বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন নিরীক্ষা অধিদপ্তরের এই তদন্তই শিক্ষকদের কাছে ‘মিনিস্ট্রি অডিট’ হিসেবে পরিচিত। যদিও ডিআইএ নামে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের কাছে দাবি করে থাকে অডিট এবং তদন্ত ভিন্ন। কিন্তু নিজেরা যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে যান তখন নিজেদের ‘মিনিস্ট্রির কর্মকর্তা এবং অডিট করতে এসেছেন’ এই দু্ই শব্দবন্ধের জাদুতে অনেকটাই সাইজ করে ফেলেন।

গত দুই/তিন মাস ধরে তদন্ত চালানো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হলোশেখ বোরহান উদ্দিন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, হাবীবুল্লাহ বাহার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ,  কমলাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মান্নান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ডেমরা কলেজ, রামপুরা একরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়,  মিরপুর শাহ আলী কলেজ এবং কল্যাণপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

তদন্তকারি একাধিক কর্মকর্তা দৈনিক শিক্ষাকে বলেছেন, মন্ত্রণালয়ে জমা হওয়া অভিযোগগুলোই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তারা তদন্ত চালাচ্ছেন। তদন্ত শেষ হওয়া একাধিক প্রতিষ্ঠানে গুরুতর কিছু অনিয়ম ধরা পড়েছে। প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর জমা দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোর তদন্ত চলছে।

উইলস লিটল ফ্ল্যাওয়ার স্কুল  এন্ড কলেজ: সহকারি প্রধান শিক্ষক রফিকুল  ইসলাম ও নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও সেসব বিষয়ে কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত করেনি পরিদর্শক দল। বাংলা মাধ্যমের একটি শাখা খুলে ৫৪ জনকে অবৈধভাবে নিয়োগ দেয় ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে। শাখাটি বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ করে ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। তাদেরকে স্কুল ফাণ্ড থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে। রফিক ও নাসিরের বিরুদ্ধে খণ্ডকালীন শিক্ষক সায়েদুজ্জামানকে দিয়ে ভুয়া অনলাইন খুলে সাংবাদিকতার কার্ড বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। রাজশাহী কলেজের শিবির নেতা সায়েদুজ্জামানকে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে চাকরি দিয়েছেন নাসির উদ্দিনই। মতামতের জন্য নাসির ও রফিককে টেলিফোন করেও পাওয়া যায়নি।

তবে, উইলস স্কুলটিতে ডিআই টিম শুধু কতিপয় শিক্ষককে দেয়া কিছু সুবিধা বন্ধ করার বিরুদ্ধে করা একটি আবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত করছে।  বর্তমান পরিচালনা কমিটি  এই সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে মর্মে অভিযোগ করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ে।

ভিকারুননিসা: জানা গেছে, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও হিসাবরক্ষণ অফিসার পদের জন্য গত নভেম্বরে লিখিত নিয়োগ পরীক্ষা হয়। দুই প্রার্থীর খাতায় টেম্পারিং করে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন অধ্যক্ষ অধ্যাপক ফৌজিয়া এবং গভর্নিং বডির শিক্ষক প্রতিনিধি ফাতেমা জোহরা হকের বিরুদ্ধে। ভিকারুননিসার অভিভাবক ফোরামের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে অভিযোগ করা হয়। নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি কয়েকজন শিক্ষক ও গভর্নিং বডির সদস্যদের নজরে এলে কমিয়ে ফের আগের নম্বর দেওয়া হয়। প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষায় এক ব্যক্তিকে চাকরি পাইয়ে দিতে তৎকালীন অধ্যক্ষ ও শিক্ষক প্রতিনিধি আর্থিক চুক্তি করেন বলেও অভিযোগ ওঠে। তখন তৎকালীন গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সেই তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। তার ভিত্তিতে ২৯ ডিসেম্বর অধ্যক্ষ ফওজিয়াকে ওএসডি করে তার স্থানে মিরপুর দুয়ারিপাড়া সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কামরুন নাহার মুকুলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। নিয়োগ পরীক্ষার খাতায় নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ গত ১২ জানুয়ারি ফাতেমা জোহরা হককে চাকরিচ্যুত ও তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গভর্নিং বডিকে নির্দেশ দেয়।

এ ছাড়া গত ১৭ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আনোয়ারুল হক স্বাক্ষরিত এক পত্রে ভিকারুননিসার আর্থিক বিষয়ে তদন্ত ও অডিট করতে ডিআইএকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিআইএর যুগ্ম পরিচালক বিপুল চন্দ্র সরকার সমকালকে বলেন, শিগগিরই তদন্ত কমিটি হবে ও তদন্ত দল ভিকারুননিসায় যাবে।

শেখ বোরহান উদ্দিন: জানা গেছে, শেখ বোরহান উদ্দিন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের জন্য কেরানীগঞ্জে জমি কেনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করেছে ডিআইএ। অভিযোগের তীর প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক হারুনর রশিদ খান ও সাবেক দুই শিক্ষক প্রতিনিধির দিকে। ডিআইএর উপপরিচালক রসময় কীর্ত্তনিয়ার নেতৃত্বে চার সদস্যের তদন্ত দল মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তদন্ত দলের বাকি সদস্যরা হলেনথ শিক্ষা পরিদর্শক এএইচএম জাহাঙ্গীর আলম, শিক্ষা পরিদর্শক হেমায়েত উদ্দিন এবং অডিট অফিসার ফরিদ উদ্দিন। তবে, এই কলেজে জামাত-শিবিরের নিয়োগ এবং অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করেননি তারা। প্রতিবেদন দেখলে মনে হয় শুধু হারুন অর রশিদকে ধরার জন্যই তদন্ত চলেছে।

জমি কেনায় দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গভর্নিং বডির সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হারুনর রশীদ খান দৈনিক শিক্ষাডটকমকে বলেন, জমি কেনায় কোনো অনিয়ম হয়নি। প্রতিটি কাজ নিয়ম মেনে হয়েছে। স্বচ্ছভাবে কেনার যাবতীয় প্রমাণ তার কাছে আছে।

তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, তিনি সভাপতি থাকাকালে অধ্যক্ষ ও তার গ্রুপের লোকজনকে কোনো ব্যবসা ও লুটপাট করতে দেওয়া হয়নি বলে তারা নানা অভিযোগ করছে। পরীক্ষায় বেশি নম্বর দেওয়ার শর্তে অধ্যক্ষ নগদ পাঁচ লাখ টাকা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তোলেন। এটি ধরার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। তার দাবি, জমি কেনার বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও তদন্ত করেছে। সেখানে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। ডিআইএ তদন্ত করে বিপক্ষে রিপোর্ট দিলেও কমিটির আহ্বায়ক রসময় কীর্ত্তনিয়া তাকে ‘সরি’ বলেছেন বলেও দাবি করেন।

জানতে চাইলে রসময় কীর্ত্তনীয়া বলেন, কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

শহীদ জিয়া উচ্চ বালিকা স্কুল ও কলেজ: অন্যায়ভাবে শিক্ষকদের বহিস্কার, দায়িত্বে অবহেলা, প্রশাসনিক অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির দায়ে চাকরি হারাতে যাচ্ছেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শহীদ জিয়া উচ্চ বালিকা স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ ফাতেমা রশিদ। ডিআইএর তদন্তে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২৭ জানুয়ারি ঢাকা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ স্কুলটির গভর্নিং বডিকে ওই অধ্যক্ষকে চাকরিচ্যুত করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে অন্যায়ভাবে বহিস্কার করা পাঁচ শিক্ষককে স্বপদে বহাল করে সাত দিনের মধ্যে বোর্ডকে জানাতেও বলা হয়েছে এ চিঠিতে।

যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল:যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক আবু ইউসুফ প্রতিষ্ঠানের সাড়ে ছয় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে ধরা পড়েছে ডিআইএর তদন্তে। এ ঘটনায় নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি চাকরিচ্যুত হয়েছেন। শিক্ষকদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাও আত্মসাতের ঘটনা সেখানে ঘটেছে। চলতি মাসে আরেক দফা এ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়মের তদন্ত চালাচ্ছে ডিআইএর তিন সদস্যর প্রতিনিধি দল। তারা বিপুল আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এই প্রতিষ্ঠানের একজন প্রভাবশালী শিক্ষকের আত্মীয় শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন বিতর্কিত উপ-পরিচালক।

একরামুন্নেছা স্কুল: রামপুরা একরামুন্নেছা স্কুলের শিক্ষকরা ডিআইএতে লিখিত অভিযোগ করেছেন, প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা বিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে মূল একাডেমিক ভবনের পঞ্চম তলায় ক্লাস রুম ভেঙে পাঁচ রুমের বিলাসবহুল টাইলস, উন্নত কাঠের দরোজাসহ নান্দনিক ডেকোরেশন সমৃদ্ধ আবাসিক ফ্ল্যাট তৈরি করেছেন। ব্যক্তিগত আবাসিক ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসের বিল সব বিদ্যালয়ের টাকা থেকে দেওয়া হচ্ছে। ফ্ল্যাটের প্রতিটি কক্ষেই বিদ্যালয়ের টাকায় কেনা হয়েছে এসি। অভিযোগগুলো তদন্ত করছে ডিআইএ।

কমলাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ: কমলাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের অনিয়মের তদন্ত করে এ সপ্তাহে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে ডিআইএর শিক্ষা পরিদর্শক এনামুল হকের নেতৃত্বাধীন তদন্ত দল। এতে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ বশির আহমেদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের চার লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। এ ছাড়া এসি কেনার প্রক্রিয়ায় গলদ ও দোকান বরাদ্দে অনিয়মের প্রমাণও মিলেছে এ প্রতিষ্ঠানে।- দৈনিক শিক্ষা

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

More News Of This Category
© All rights reserved © 2022 shikkhajob.com
Developed by: MUN IT-01737779710
Tuhin