করোনা সংকটে নারীর কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন ভাবনা

  • 31
    Shares

সোনিয়া চৌধুরী সুমি:

বিজিএমইএ’র সভাপতি রুবানা হকের বরাত দিয়ে একটা সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে কদিন ধরে। হ্যাঁ; ছাঁটাই হবে গার্মেন্টস কর্মী, সে কথা বলছি। গার্মেন্টস কর্মী ছাঁটাই হবার অর্থ হচ্ছে একদল নারী ও পুরুষের কাজ তথা উপার্জন হারানো। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প কারখানার শ্রমিকদের বড় একটা অংশ নারী। শ্রমিক ছাটাই শুরুর সাথে সাথে এই নারীদের একটা অংশ কর্মহীন, অর্থহীন, সামর্থ্যহীন এবং সাংসারিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ক্ষমতাহীন হবে। এটার তাও একটা হিসেব পাওয়া যায়, পাওয়া যাবে, যেহেতু এটা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাজের ভেতর পড়ে।

এইবার আসি গৃহকর্মী হিসেবে সারা বাংলাদেশে কর্মরত নারীদের প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের সব ছোট বড় শহরে ব্যপক সংখ্যক নারী খন্ডকালীন গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত। তাদের জন্য বহুল প্রচলিত নাম ‘ছুটাবুয়া’।এরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন বস্তিতে থাকে, উদয়াস্ত পরিশ্রম করে উপার্জন করে এবং অনেকেই এই উপার্জনের বড় একটা অংশ গ্রামে পাঠায়। কোভিড 19 জনিত লকডাউন শুরু হবার পর থেকে এরা কতজন কতভাবে কর্মহীন হয়েছে তার খবর আমরা কেউ কি জানি সঠিক?

আমি কয়েকটা কেস স্টাডির মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছি।

কেস স্টাডি :

আনারকলি একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। প্যানডেমিক জনিত লক ডাউনে মার্চের বিশ তারিখ বুয়াকে বিদায় দিয়েছেন চলতি বেতন এবং বাড়তি কিছু টাকা দিয়ে। ব্যবসার পুঁজি থেকে কিছু টাকা নিয়ে একটা ওয়াশিং মেশিন কিনেছেন। জুন মাসে তার প্রতিবেশীরা কেউ কেউ আবার বুয়া নিয়োগ করলেও তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। প্রথমত, তার নিজের বিজনেস বন্ধ, দ্বিতীয়ত, ওয়াশিং মেশিন কেনার সময় ই ভেবেছেন বুয়া না রেখে টাকা গুছিয়ে ওয়াশিং মেশিন কিনতে যে টাকা খরচ হয়েছে তা পূরণ করতে হবে। তবেই আবার বুয়া নিয়োগের কথা ভাববেন।

কেস স্টাডি :

জরিনা তিনটা বাসায় কাজ করতো। সবাই মার্চ মাসের সম্পূর্ণ বেতন দিয়েছেন। এক ম্যাডাম তিন মাস বিনা কাজে বেতন দিয়ে নতুন কাজ খুঁজে নিতে বলেছেন। রোগের ভয়ে কেউ নতুন লোক কাজে রাখতে চায় না।

কেস স্টাডি  :

ষাটোত্তীর্ণ ঝর্ণা বেগম অস্টিওআথরাইটিস’র রোগী। তিনি পায়ে ব্যথায় নাজেহাল থাকেন। কিন্তু প্রতিদিন ফিজিওথেরাপিস্টকে বাসায় ডাকতে ভালো লাগে না। ঝর্ণা বেগম পরিচিত এক বুয়াকে দিয়ে নিয়মিত পায়ে তেল মালিশ করে নেন। তাতে তার আরাম বোধ হয় ; বুয়া এই উপার্জন তার দশম শ্রেণী পড়ুয়া মেয়ের পড়াশোনার জন্য খরচ করে। প্যানডেমিক জনিত লক ডাউনে মালিশের বুয়ার আয় এখন বন্ধ।

কেস স্টাডি  :

আজেফার পরিবারে তার দুই ছেলে ও স্বামীর আয় ভালো। আজেফা একটা মাত্র বাসায় চার কাজ করে, সেই টাকায় নিজের স্বাদআহ্লাদ মিটিয়ে বৃদ্ধ মা কে সাহায্য করে। কিন্তু লকডাউনের সময় থেকে তারও কাজ বন্ধ। এই মাসে আপা কাজে নিয়েছে, তবে দুই কাজের জন্য। অতএব তার উপার্জন এখন অর্ধেক। পাড়ায় নতুন কোন কাজও পাচ্ছে না; কমেছে পরিবারের বাকি সদস্যদের আয়।

কেস স্টাডি  :

হালিমা বুয়ার ভাগ্য ভালো বলতে হবে। মার্চের মাঝামাঝি তিন বাসার পুরো বেতন, কিছু খাবার ও টাকা সাহায্য নিয়ে ছুটিতে গেছে। এপ্রিল, মে দুইমাস দুটো বাসা থেকে আংশিক ও এক বাসা থেকে সম্পূর্ণ বেতন পেয়েছে। সাথে নিয়মিত তার কপালে ত্রাণ ও জুটেছে। সে সিদ্ধান্ত নেয়, বাঁধা বুয়া হিসেবে আপাতত কাজ করবে, সব স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত। কাজের প্রস্তাব পেয়ে অন্য পুরাতন বাসায় জানায় সে বাঁধা কাজ নিচ্ছে। পরবর্তীতে প্রস্তাবিত সেই বাসায় কাজ না পেয়ে সম্পূর্ণ উপার্জন হারা অবস্থায় গ্রামে চলে যায় সে।

এগুলো কয়েকটি ঘটনা মাত্র।কিন্তু এই ঘটনাগুলো থেকে আমরা কিছু বিষয়ে ধারণা পাই;

# সংক্রমণ থেকে বাঁচতে মানুষ ঘরে বহিরাগতদের আনাগোনা নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য হচ্ছে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই কর্মহীন হয়ে পড়ছে খন্ডকালীন গৃহকর্মীরা।

# অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও চাকুরিজীবীর উপার্জন কমে গেছে বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, তাই তাদের পক্ষে গৃহকর্মী রাখা আর সম্ভব হচ্ছে না।

# তুলনামূলক বেশি বেতন, জায়গার অভাব, অন্যান্য সমস্যার কারণে মানুষ বাঁধা গৃহকর্মী রাখতে পারছে না বা রাখতে চায় না।

# বহু ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ৩০-৫০% টাকা কেটে নিয়ে বেতন দিচ্ছে কর্মীদের। এমন অবস্থায় কাজ ছাড়া দিনের পর দিন ছুটা বুয়াদের বেতন চালিয়ে যাওয়া মানুষের পক্ষে কঠিন হচ্ছে; সম্ভব হচ্ছে না। অতএব ছাঁটাই হচ্ছে তারা।

# বহু ছোটখাটো চাকরি বা ব্যবসা করা নারী সম্পূর্ণ বেকার হয়ে পুরোদস্তুর গৃহিণীতে পরিণত হয়েছেন। তারা অদূর ভবিষ্যতে যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, তবুও গৃহকর্মী নিয়োগের চিন্তা করবেন না।

# স্বাভাবিক সময়ে কিছু ছুটা বুয়া এবং কিছু নিয়োগকর্তার অভ্যাস হলো নিয়মিত বাসা/বুয়া পরিবর্তন করা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন ভাবে কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

# গবেষকরা বারবার হুঁশিয়ার করেছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন থাকবে। তাই মানুষ কাজের জন্য বহিরাগত ব্যাক্তির উপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে, করবে।

# এই পরিস্থিতি, পৃথিবী জুড়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু, প্রিয়জন হারানোর ভয় মানুষকে ‘হাইজিন’ নিয়ে নতুন ভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। তাই বহু মানুষ বহিরাগত কর্মীদের উপর নির্ভরশীলতা থেকে গা ঝাড়া দিয়ে উঠছে, উঠবে।

# মানুষ যখন পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হচ্ছে গৃহকর্মী ছাড়া চলতে, তখন প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি নির্ভর হচ্ছে মানুষ। অনেক ঘরে ঘরেই এখন ওয়াশিং মেশিন, ম্যাজিক মপ, চপিং বোর্ড, ব্ল্যান্ডার, রুটি মেকার ইত্যাদির ব্যবহার বেড়েছে বা নতুন করে হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে আবার ছুটা বুয়া নিয়োগ হলেও নিঃসন্দেহে তাদের কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত হবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

# বর্তমান আপদকালীন সময়ে সামাজিক ট্যাবু ভেঙে অনেক পুরুষমানুষ এবং শিশুরা গৃহকর্মে অংশগ্রহণে অভ্যস্ত হচ্ছে, সাহায্য করছে। নিজের কাজ নিজে করার এই অভ্যাস গৃহকর্মী নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনবে।

# উপরে আলোচনা করা ঘটনাগুলো ঘটলে স্বাভাবিক ভাবে কর্মীর তুলনায় কাজের প্রাপ্যতা কম হবে। ফলে স্বাভাবিক প্রবণতা হবে মজুরি হ্রাস। অর্থাৎ আগে পাঁচ হাজার টাকা উপার্জন করতে একজন গৃহকর্মী যে পরিমাণ শ্রম দিতো, এখন সেই একই টাকা উপার্জনে তাকে বেশি শ্রম দিতে হতে পারে।

# শহরাঞ্চলে জীবনযাপন ব্যয়বহুল। কাজের অভাব তৈরি হলে গ্রাম থেকে শহরে আসা নারীরা আবার গ্রামমুখী হবে।

# নারীদের উপার্জন কমে যাওয়ার ফলে পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্ব কমবে। শুধু তাই নয়, নারী নির্যাতনের হার বৃদ্ধি পাবে।

# শহরের বস্তিবাসী পরিবার এবং ভাসমান পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো বিবেচনা করলে দেখা যায় পরিবার পরিচালনা ব্যয়ের ক্ষেত্রে নারীর অবদান পুরুষের সমান অথবা বেশি। এক্ষেত্রে পারিবারিক আয় সংকুচিত হবে, অর্থাৎ দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাবে।

# দারিদ্র্য বৃদ্ধির ফলাফল হিসেবে এসব পরিবারের শিশুদের শিক্ষা গ্রহণ কার্যক্রম ব্যহত হবে, শিশুশ্রম এর প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে।

# শহরে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করা নারীরা গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে কিছু না কিছু ভূমিকা পালন করে। অনেক কৃষক পরিবারে কৃষি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল যোগাড় হয় এই আয়ের টাকায়। তাই পরোক্ষ ভাবে এটা কৃষি উৎপাদনকে খুব সামান্য হলেও ব্যহত করবে।

# নারীরা কর্মহীন হলে দেশে নির্ভরশীল জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই প্রায়শই দেশের মানুষের গৃহকর্মীদের উপর নির্ভরশীলতা নিয়ে সমালোচনায় মুখর হন। কিন্তু একথা কেউ গভীরভাবে চিন্তা করেন না যে এই নির্ভরশীলতা পারস্পরিক। এই আদি অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশার কারণে কয়েক লক্ষ নারী শুধু সাবলম্বী নয়, তারা পারিবারিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

কয়েকদিন আগে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক রাশেদ মাহমুদ স্যারের( নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) একটা চমৎকার বুক রিভিউ পড়লাম, ডেভিড গ্রেবারের ‘Bullshit Jobs’ বইয়ের উপর। স্যার আলোচনা শুরু করেছেন ‘আজাইরা কাজ’ ও ‘অবসরের মালিকানা’ প্রপঞ্চ ব্যবহার করে। স্যারের বিশ্লেষণটা মাথায় গেঁথে আছে লিখাটা পড়ার পর থেকেই। গত কয়েকদিন সংসারের কাজ করতে করতে যে বিষয়টা আমাকে ভাবনার খোরাক দিচ্ছে তা হলো; আমার গৃহকর্মে এতো বছর ধরে নিয়োজিত কর্মী দিয়ে আমি যা কিছু করাই, তা ওই ‘আজাইরা কাজ’ ই। কারণ এই প্রতিটা কাজ আমি নিজেই করতে পারি, এটা গত তিনমাসে প্রমাণিত। ঘটনা হলো, এই আজাইরা কাজের ধারা যুগযুগান্তরে টিকে আছে বলেই কিছু মানুষ অতি প্রয়োজনীয় উপার্জনটুকু করে নিচ্ছে। সাথে আমরা নিজেদের অবসর তৈরি করে আরো কিছু ‘আজাইরা কাজ’ করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছি বটে। এই লিখাটাও তেমন একটা ‘আজাইরা কাজ’।

লেখক : সহকারি শিক্ষক মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরী স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা

সূত্র: নগরপত্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *